রবিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১২

হাদিসের প্রামাণিকতার উপর সাহাবিদের আমল


সাহাবায়ে কেরাম তাদের জীবনে হাদিসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর অনুসরণ করেছেন, তার নির্দেশ পালন করেছেন এবং ছোট-বড় প্রত্যেক বিষয়ে তারা তার শরণাপন্ন হয়েছেন। তারা রাসূলের এত অনুসরণ করতেন যে, কোন কারণ ও হিকমত জানা ছাড়াই তিনি যা করতেন তারা তাই করত, তিনি যা পরিহার করতেন তারাও তা পরিহার করত। যেমন ইমাম বুখারি ইব্‌ন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ একটি স্বর্ণের আঙটি পরিধান করেছিলেন, ফলে লোকেরাও স্বর্ণের আঙটি পরিধান করে। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ তা এ বলে নিক্ষেপ করেন: “আমি কখনো তা পরিধান করব না, ফলে লোকেরাও তাদের আঙটি ফেলে দেন”।[1]
ইমাম আবু দাউদ আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ তার সাহাবিদের নিয়ে সালাত আদায় করতে ছিলেন, হটাৎ তিনি জুতো খুলে বাম পাশে রেখে দেন। যখন লোকেরা তাকে দেখল, তারাও তাদের জুতো নিক্ষেপ করল। অতঃপর তিনি সালাত আদায় করে বলেন: তোমরা কেন তোমাদের জুতো নিক্ষেপ করেছ, তারা বলল: আমরা আপনাকে দেখেছি আপনি জুতো নিক্ষেপ করেছেন, তাই আমরাও আমাদের জুতো নিক্ষেপ করেছি। তিনি বললেন: জিবরিল আমার নিকট এসে বলল যে, জুতোতে ময়লা রয়েছে”।[2]

ইজমায়ে উম্মত:
আমরা যদি আদর্শ পূর্বসূরি ও তাদের পরবর্তী ইমামদের পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে আমরা এমন কাউকে পাব না, যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ ইমান, সামান্য কল্যাণ ও ইখলাস রয়েছে, তিনি হাদিসকে অস্বীকার করেছেন, বা তাকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেননি, তার দাবি অনুযায়ী আমল করেননি; বরং এর বিপরীতে আমরা দেখি যে, তারা সকলে হাদিস আঁকড়ে ধরেছেন, তার আদর্শে আদর্শবান ছিলেন, অতি আগ্রহ ও উৎসাহ নিয়ে তার উপর আমল করেছেন, এবং তার বিরোধিতা থেকে সতর্ক করেছেন। কারণ একটাই যে, হাদিস ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস, হাদিসের উপর নির্ভর করে কুরআনুল কারীম বুঝা ও তার অধিকাংশ আহকাম। অতএব সন্দেহ নেই হাদিসের প্রামাণিকতার উপর উম্মতের ইজমা ও ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং এ বিষয়ে তাদের অন্তরে কোন দ্বিমত নেই। ইমাম শাফে‘ঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, যার নিকট হাদিস প্রমাণিত হল, তার কোন সুযোগ নেই অন্য কারো কথায় তা ত্যাগ করা”।[3]
তিনি আরো বলেন: “আমি এমন কাউকে শুনিনি, যাকে মানুষ আহলে ইলম বলে অথবা যিনি নিজেকে আহলে ইলম বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের‎ ফয়সালাকে মেনে নেয়া, একমাত্র তার অনুসরণ করা, কোন অবস্থাতে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের হাদিস পরিহার না করা, কুরআন ও হাদিস ব্যতীত যাবতীয় বিষয় কুরআন ও হাদিসের অনুগত; আমাদের উপর, আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের‎ হাদিস মেনে নেয়া, তার সংবাদ গ্রহণ করা ওয়াজিব ইত্যাদি বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন”।[4]
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلًا ٥٩ ﴾ [النساء : ٥٩]   
“অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যর্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর”।[5] এ আয়াত প্রসঙ্গে ইমাম ইব্‌ন হাযম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “সকল উম্মত এ ব্যাপারে একমত যে, এ সম্বোধন আমাদের ও সকল মখলুকের প্রতি, যাদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টি করা হবে ও যেসব রূহ শরীরে সঞ্চার করা হবে, হোক সে জিন বা মানুষ। যেমন এ সম্বোধন ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের‎ যুগে সবার প্রতি, তাদের পরবর্তীতে যারা আসবে তাদের উপর সমানভাবে প্রযোজ্য হবে”।[6]
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “জানা আবশ্যক যে, এমন কোন ইমাম নেই, উম্মতের নিকট যার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তিনি স্বেচ্ছায় ছোট কিংবা বড় কোন বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের‎ বিরোধিতা করেছেন। কারণ তারা সবাই একমত ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের‎ অনুসরণ করা ওয়াজিব, প্রত্যেকের কথা গ্রহণ করা ও ত্যাগ করার সুযোগ রয়েছে, একমাত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ব্যতীত”।


[1] বুখারি, ৫৮৬৭।
[2] আবু দাউদ, ৬৫০।
[3] ই‘লামুল মুওয়াক্কিয়িন: (১/৫২৫)
[4] আল-উম্ম: (৭/৪৬০)
[5] সূরা আন-নিসা: (৫৯)
[6] আল-ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম: (১/৯৭)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন